পাশাপাশি ইউরোপ ও এশিয়ায় গ্যাস সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
সাদ আল-কাবি রয়টার্সকে বলেন, ‘নজিরবিহীন এ হামলায় কাতারের ১৪টি এলএনজি ইউনিটের মধ্যে দুটি এবং দুটি গ্যাস টু লিকুইড (জিটুএল) কারখানার একটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ক্ষয়ক্ষতির কারণে বছরে প্রায় ১ কোটি ২৮ লাখ টন এলএনজি উৎপাদন বন্ধ থাকবে, যা মেরামত করতে তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমি কখনো স্বপ্নেও ভাবিনি যে কাতার এবং এ পুরো অঞ্চল এমন একটি হামলার শিকার হবে। বিশেষ করে রমজান মাসে একটি মুসলিম ভ্রাতৃপ্রতিম দেশ আমাদের ওপর এভাবে হামলা চালাবে, তা ছিল কল্পনারও বাইরে।’
এর আগে ইরানের গ্যাস অবকাঠামোয় হামলা চালিয়েছিল ইসরায়েল। সে ঘটনার জেরে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি তেল ও গ্যাস কেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্য করে একের পর এক হামলা চালায় ইরান।
কাতারএনার্জির সিইও বলেন, ‘দুটি ট্রেন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ইতালি, বেলজিয়াম, দক্ষিণ কোরিয়া ও চীনে এলএনজি সরবরাহের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির ওপর কাতারএনার্জিকে ‘ফোর্স মাজর’ (অনিবার্য পরিস্থিতিজনিত চুক্তি স্থগিতাদেশ) জারি করতে হবে, যা পাঁচ বছর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। আমরা আগে একবার এমন ঘোষণা দিয়েছিলাম, তবে সেটা ছিল অল্প সময়ের জন্য। কিন্তু এখন এ পরিস্থিতি কতদিন চলবে, তা নিশ্চিত নয়।’
এর আগে কাতারের রাস লাফান গ্যাস উৎপাদন কেন্দ্রে হামলার পর পুরো এলএনজি উৎপাদনের ওপর ফোর্স মাজর জারি করেছিল কাতারএনার্জি। গত বুধবার ওই একই কেন্দ্রে আবারো হামলা চালানো হয়। তিনি বলেন, ‘এসব কেন্দ্রে উৎপাদন আবার শুরু করার জন্য সবার আগে যুদ্ধ বন্ধ হওয়া প্রয়োজন।’
ক্ষতিগ্রস্ত এলএনজি কেন্দ্রগুলোয় মার্কিন জ্বালানি তেল জায়ান্ট এক্সনমবিল অংশীদার হিসেবে রয়েছে। অন্যদিকে, ক্ষতিগ্রস্ত জিটিএল কারখানায় অংশীদার হিসেবে আছে শেল। এ কারখানা মেরামত করতে এক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
কাবি জানান, টেক্সাসভিত্তিক কোম্পানি এক্সনমবিলের এলএনজি ইউনিট ‘এস-৪’-এ ৩৪ শতাংশ এবং ‘এস-৬’ ইউনিটে ৩০ শতাংশ অংশীদারত্ব রয়েছে।
উৎপাদন ইউনিট এস-৪ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ইতালির এডিসন এবং বেলজিয়ামের ইডিএফটি কোম্পানিতে গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদিকে, ইউনিট এস-৬ অচল হওয়ার প্রভাব পড়ছে দক্ষিণ কোরিয়ার কোগাস, ইডিএফটি ও চীনে শেলের গ্যাস সরবরাহের ওপর।
কাতারএনার্জির সিইও বলেন, ‘এ হামলার ক্ষয়ক্ষতি পুরো অঞ্চলকে ১০ থেকে ২০ বছর পিছিয়ে দিয়েছে। অবশ্যই জায়গাটি অনেক মানুষের কাছে একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু আমার মনে হয়, সেই নিরাপদ ভাবমূর্তি এখন বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে।’
ইরানের হামলার নেতিবাচক প্রভাব শুধু এলএনজির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। কাতারের কনডেনসেট (এক ধরনের জ্বালানি তেল) রফতানি প্রায় ২৪ শতাংশ কমে যাবে এবং এলপিজি রফতানি কমবে ১৩ শতাংশ। এছাড়া হিলিয়াম উৎপাদন ১৪ শতাংশ এবং ন্যাপথা ও সালফার উৎপাদন ৬ শতাংশ হ্রাস পাবে। এসব উৎপাদনের ঘাটতির প্রভাব ভারতের রেস্তোরাঁগুলোয় ব্যবহৃত এলপিজি থেকে শুরু করে দক্ষিণ কোরিয়ার চিপ নির্মাতাদের ব্যবহৃত হিলিয়ামসহ সব ক্ষেত্রেই পড়বে।
কাবি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত ইউনিটগুলো তৈরি করতে প্রায় ২ হাজার ৬০০ কোটি ডলার খরচ হয়েছিল। বর্তমানে কাতারের নর্থ ফিল্ড সম্প্রসারণ প্রকল্পের সব কাজ বন্ধ রয়েছে, যা এক বছরেরও বেশি সময় পিছিয়ে যেতে পারে।
তিনি আরো বলেন, ‘ইসরায়েল যদি ইরানকে আক্রমণ করে থাকে, তবে সেটা তাদের দুই দেশের ব্যক্তিগত ব্যাপার। এর সঙ্গে আমাদের বা এ অঞ্চলের কোনো সম্পর্ক নেই। তাই এখন আমি পরিষ্কার করে বলছি—ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র বা বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশই হোক না কেন, সবারই উচিত তেল ও গ্যাস স্থাপনাগুলো থেকে দূরে থাকা।’

No comments:
Post a Comment